কিছু বহুল প্রচলিত প্রশ্ন, দাবী বা চাওয়াঃ

১. একটা এসওপি এর টেমপ্লেট কেমন?
২. একটা লেটার অফ রেকমেন্ডেশন এর টেম্পলেট কেমন?
৩. প্রোফেসরকে মেইল করার কোন টেম্পলেট আছে?
৪. সিভি বা রেজুমে কী করে লিখতে হয়?

তার চেয়েও বড় প্রশ্নঃ কপি-পেস্ট না করে লেখার কোন উপায় আছে?!

যেকোনো ডকুমেন্ট তৈরি করতে গেলে থাম্ব রুল হল, সেটা নিজে তৈরি করা উচিৎ। বৈশিষ্ট্য হবে – তা সংক্ষিপ্ত, পূর্ণাঙ্গ, সত্য, এবং Specific. অনেকেই কিছু একটা লিখতে গেলে খুব বড় হয়ে যায়। অনেকে কিছু লিখতে গেলে স্বকীয়তা বজায় রাখতে পারে না, অবচেতন মনেই কপি-পেস্ট করে ফেলে, বহুদিনের অভ্যাস!

নিজে একটু কষ্ট করে, সময় নিয়ে তৈরি করলে সুন্দর হবে। জিনিসটা নিজের বলে মনে হবে। তার চেয়েও বড় কথা, আপনি যেগুলোকে খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন – অর্থাৎ রঙচঙে হতে হবে, খুব জটিল ইংরেজিতে লিখতে হবে, সমস্ত তথ্য এক করতে হবে ইত্যাদি – সেগুলো আসলে কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।

যদি কোন টেম্পলেট দেখতেই হয়, তাহলে দেখুন আইডিয়া নেয়ার জন্য। ফরম্যাটশুদ্ধ কপি করে দিলে তা আপনার জন্যই অসম্মানজনক। কবে দেখবেন ভুল করে অন্যের নামধাম দিয়েই সাবমিট করে বসেছেন!

আমাদের সাধারণ অভ্যাস হল আসল কথা না বলে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে, ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে, অনাবশ্যক দীর্ঘ করে, সমস্ত তথ্যের গুদাম বানিয়ে একটা ডকুমেন্ট তৈরি করা। মিথ্যা তথ্য দেয়া, অতিরঞ্জিত করা তো আছেই। কাজেই এখন থেকে সবসময় মনে রাখুন, Be concise and specific.

statement-of-purpose-writing-help

Statement of Purpose (SOP):

আমি যখন প্রথম এসওপি লিখি, তখন সেটি হয়েছিল খুব আবেগঘন, বিশাল লম্বা, আর গল্পের মত – একটা দুঃখী ছেলের অর্থহীন ন্যাকামোতে ভর্তি! যেন এই ভার্সিটিতে আমাকে ভর্তি না করলে একটি মানবিক বিপর্যয় ঘটে যাবে! পরে ভাইয়ের পরামর্শ নিয়ে জিনিসটাকে কেটেছেঁটে প্রোফেশনাল বানিয়েছিলাম।

এসওপিতে এটাই শর্ত। এক-দেড় পেজের মধ্যে লিখবেন। সংক্ষেপে লিখবেন। প্রথম প্যারায় বলুন আপনি এখানে অ্যাপ্লাই করেছেন, এই প্রোগ্রামে। আপনার প্রোফাইল এই। দ্বিতীয় প্যারায় বলুন আপনার আণ্ডারগ্র্যাডের ভার্সিটি, প্রোগ্রাম, কাজ ইত্যাদি। তৃতীয় প্যারায় বলুন আপনার রিসার্চ ইন্টারেস্ট, রিসার্চওয়ার্ক ইত্যাদি। চতুর্থ প্যারায় বলুন কেন এই ভার্সিটিকে চয়েজ করলেন। তৃতীয় আর চতুর্থ প্যারার মধ্যে যেন একটা সামঞ্জস্য বা যোগসূত্র থাকে। ব্যস, এসওপি শেষ। ঝরঝরে ইংরেজিতে লিখুন, জটিল ইংরেজিতে নয়। নিজের ভাষায় লিখুন, অন্যের ভাষায় নয়। যা নেই তা নিয়ে না হয় না-ই লিখলেন। না হয় একটু সাধারণ হল, চোখ ঝলসে যাবার মত না-ই হল। তারপরও যেন নিজেরই হয়। হাজার হাজার এসওপি যারা প্রতি বছর পড়ে, তারা একটা কপি-পেস্ট করা লেখা খুব সহজেই ধরতে পারবে। নিশ্চিত করুন সব ঠিকঠাক লিখেছেন, সত্যি লিখেছেন, অতিরঞ্জিত করেন নি। অর্থাৎ মার্জিত ইংরেজিতে নিজের কেইসকে প্রেজেন্ট করুন।

প্রথম খসড়া লিখে ফেলে রাখুন কয়েকদিন। তারপর আবার বসুন। অনেক ভুল বেরুবে। একটু একটু করে পালিশ করুন। মাসখানেকের মধ্যে নির্ভুল হয়ে উঠবে। বানান ভুল ক্ষমার অযোগ্য, কাজেই এগুলো ঠিক করুন।

এবার আপনি নিজেই এসওপি লিখতে পারবেন।

letter of recommendation

Letter of Recommendation (LOR):

অনেক সময় টিচারের সময় থাকে না নিজে লেখার। তাই ছাত্রকে লিখে নিয়ে যেতে বলেন। আর ছাত্র সুযোগ পেয়ে নিজের সম্পর্কে যা লেখে, তাতে সে এ যুগের বিস্ময়বালক! এভাবে লেখা থেকে সাবধান।

থিসিস সুপারভাইজার রেকো দিলে, তাতে নিজের আণ্ডারগ্র্যাড ওয়ার্ক লিখুন। অ্যাডভাইজার রেকো দিলে, তাতে তিনি কীভাবে আপনাকে চেনেন তা লিখুন, আর নিজের কিছু অন্যান্য কাজকর্ম লিখুন। কোর্স টিচার রেকো দিলে, তাতে কোর্সওয়ার্কের গ্রেড সম্পর্কে লিখুন। সাদামাটা লিখুন, এক পেজে শেষ করুন। এভারেজ মানুষের জন্য এভারেজ রেকোই যথেষ্ট, আণ্ডারগ্র্যাডের একজন ছাত্রের কাছ থেকে ভার্সিটি আসলে তেমন কিছু আশা করে না, টিচার আপনাকে চেনেন এটা বুঝলেই যথেষ্ট। ক্লাস টেনে ফার্স্ট বয় ছিলেন – এ জাতীয় তথ্য কোন ডকুমেন্টেই দেবেন না!

রেকোমেন্ডেশনের বিস্তারিত ব্যাপারস্যাপার নিয়ে আলাদা একটা পোস্ট লিখেছি, কাজেই এটি এখানে সংক্ষিপ্ত করলাম।

Marketing design

Mail to professors:

অ্যাডমিশন পেয়ে গেলে প্রোফেসরদেরকে নক করা শুরু করুন (ইউএসএ এর ক্ষেত্রে)। খুব সংক্ষেপে লিখবেন। প্রোফেসর বিজি মানুষ। বড় মেইল তিনি কেন, তাঁর অ্যাসিস্টেন্টও পড়েন না। সাবজেক্টে বলুন রিসার্চের সুযোগ চান। আর বডিতে সরাসরি নিজের আণ্ডারগ্র্যাড ভার্সিটি, সিজিপিএ, জিআরই-টোফেল স্কোর, রিসার্চ ইন্টারেস্ট বলুন আর জিজ্ঞেস করুন তিনি এই সেশনে স্টুডেন্ট নেবেন কিনা। দুশ্চিন্তার দরকার নেই আপনার দুর্দান্ত প্রোফাইল বিস্তারিত ব্যাখ্যা করতে পারেন নি বলে। একটি সংক্ষিপ্ত মেইলই আপনার ভালো করবে। আপনার সম্পর্কে কিছু জানতে হলে প্রোফেসরই আপনাকে বলবেন। প্রোফেসরের অফিস টাইমে মেইল করুন। একবার সাড়া না পেলে (অথবা ঐ ভার্সিটির অন্য কোন প্রোফেসরকে নক করতে হলে) এক সপ্তাহের গ্যাপ দিয়ে আরেকবার মেইল করুন। তারপরও না পেলে কী আর করা, অন্য রাস্তা দেখতে হবে!

মেইল করার আগে তাঁর ল্যাবের ওয়েবসাইট, তাঁর নিজের ওয়েবসাইট, তাঁর পাবলিকেশন, কাজের ধরণ এসব দেখে নিন। এভাবেই বুঝতে পারবেন তিনি অ্যাক্টিভ কিনা। অ্যাক্টিভ হলেই তাঁর কাছে ফান্ডিং থাকার সম্ভাবনা বেশী। বহু বছর আগে প্রোফেসর হয়েছেন, এখন তাঁর বয়স আশি, শুধু ক্লাস নেন – এমন প্রোফেসরদের কাছে ফান্ডিং থাকে না।

প্রোফেসরের উত্তরও বুঝতে শিখুন। আমি তোমাকে অ্যাপ্লাই করতে উৎসাহিত করছি – এটি আদৌ কোন উত্তর নয়। এটি টেম্পলেট রিপ্লাই, যার অর্থ হল সমূহ সম্ভাবনা আপনার লম্বা-চওড়া মেইল উনি পড়েন নি। স্পষ্টভাবে পজিটিভ রিপ্লাই দেখলেই বুঝবেন, হয়তো আপনার ইন্টারভিউ নিতে চাইবে বা আপনার কোন ডকুমেন্ট পাঠাতে বলবে। আর নেগেটিভ হলে আরও সহজে বুঝবেন! একবারে যোগাযোগ সমস্ত সেরে না ফেলে চেষ্টা করুন ধীরে ধীরে যোগাযোগটা ডেভেলপ করতে, কয়েকবারে।
বলে রাখি, সংক্ষেপে লেখা একটি আর্ট। এটি একজন বাঙালির জন্য রপ্ত করা একটি সাধনার বিষয়! তবে লিখতে লিখতে ঠিকই কম কথায় সব সেরে ফেলা শিখে যাবেন।

আরও একটি কথা, কোন প্রোফেসর যদি বলেনও ইমিডিয়েট কোন আশা দিতে পারছেন না, তারপরও অনেক স্টুডেন্ট ছাড়তে চায় না। এক বছর ধরে যোগাযোগ রাখতে চায়। কিন্তু ফান্ডিং, প্রোফেসরের কন্ডিশন এসব খুবই অস্থিতিশীল, এই আছে এই নেই। কাজেই এক বছর ধরে ঝুলে না থেকে সম্ভবত নতুন করে অন্য কোথাও চেষ্টা করাই যৌক্তিক হবে।

কখনো কখনো মনে হবে, শ’খানেক প্রোফেসরকে মেইল করতে হবে, একজনের জন্য বরাদ্দ সময় একটা মেইলেই শেষ করতে হবে। কিন্তু না, অনেক সময় প্রোফেসর প্রথম মেইলের জবাবে হুঁ-হাঁ করবেন, দ্বিতীয় মেইলে হয়তো ইন্টারভিউ নিতে চাইবেন, তৃতীয় মেইলে হয়তো ফান্ডিং এর কথা বলবেন। কাজেই গ্র্যাজুয়ালি কমিউনিকেশন গড়ার জন্য প্রস্তুত থাকুন, আর প্রোফেশনালিজম মেইনটেইন করে যোগাযোগ রেখে যান।

আর্টিকেলটির ২য় খণ্ড পড়তে ক্লিক করুন

 

- ইসহাক খান, প্রাক্তন গ্রেক ফ্যাকাল্টি


নিচের লিংক থেকে ইসহাক খানের লেখা অন্যান্য আর্টিকেলগুলো পড়তে পারেন-

 স্টুডেন্টদের সাধারণ দুর্বলতা – পার্ট ১ – Vocabulary
 স্টুডেন্টদের সাধারণ দুর্বলতা – পার্ট ২ – Analytical Writing
 স্টুডেন্টদের সাধারণ দুর্বলতা – পার্ট ৩ – Reading Comprehension
 স্টুডেন্টদের সাধারণ দুর্বলতা – পার্ট ৪ – Speaking (TOEFL)
 Originality of writing: এসওপি, এলওআর, ইমেইলিং প্রফেসরস, সিভি ও রেজুমে (১ম খণ্ড)
 Originality of writing: এসওপি, এলওআর, ইমেইলিং প্রফেসরস, সিভি ও রেজুমে (২য় খণ্ড)
 Customized Routine: নিয়মিত ফলো করা (১ম খণ্ড)
 Customized Routine: নিয়মিত ফলো করা (২য় খণ্ড)
 আমার জন্য সঠিক রাস্তা কোনটা: বিদেশ, জিআরই, স্বদেশ, বিসিএস, চাকরি?
 রেকমেন্ডেশন বিড়ম্বনা!
 Research: রিসার্চ বা গবেষণা
 ইউএস অ্যাম্বেসির ভেতরের পরিবেশ এবং স্টেপগুলো
 ইংরেজিতে দক্ষতা এবং কিছু স্ট্র্যাটিজি
 Teaching: শেখা ও শেখানো, দেয়া ও নেয়া
 ইউএস ভিসা পাওয়া না পাওয়া এবং হায়ার স্টাডির কিছু পয়েন্ট
 জিআরই এবং টোফেল: হায়ারস্টাডির প্রস্তুতি হোক স্ট্র্যাটিজিক্যালি (পার্ট- ১)
 জিআরই এবং টোফেল: হায়ারস্টাডির প্রস্তুতি হোক স্ট্র্যাটিজিক্যালি (পার্ট- ২)
 জিআরই এবং টোফেল: হায়ারস্টাডির প্রস্তুতি হোক স্ট্র্যাটিজিক্যালি (পার্ট- ৩)
 জিআরই এবং টোফেল: হায়ারস্টাডির প্রস্তুতি হোক স্ট্র্যাটিজিক্যালি (পার্ট- ৪)
 আমার অভিজ্ঞতা: জিআরই প্রস্তুতি এবং পরীক্ষা
 আমার অভিজ্ঞতা: টোফেল প্রস্তুতি এবং পরীক্ষা
 আমেরিকায় উচ্চশিক্ষা এবং দরকারি কৌশল

Comments

comments