বমি করার কারণে আমাকে বাথরুম  খুঁজতে হল। মেয়েরা সবাই বাথরুম খুঁজছে। বাথরুম খোঁজার গৌণ কারণ বাথরুম করা আর মুখ্য কারণ সাজগোজ ঠিক আছে কিনা দেখা। বাথরুমে যেয়ে অবশ্য কারো আর সাজগোজের প্রবৃত্তি রইল না। আমেরিকার ঝা চকচকে বাথরুম নয়। বেশ খারাপ, গন্ধয়ালা বাথরুম। তার আবার সিটকিনি নেই। বাইরে থেকে একজন ধরে রেখেছে। ইমরান ভাইয়ের বউ আয়শা ভাবী আমার সিটকিনি ধরলেন। ধরেই এমন হাসি, আমি তো ভয়ে অস্থির। বললেন, ভয়ের কিছু নেই। তুমি গন্ধ না ছাড়া পর্যন্ত আমি আছি। বলেই খিলখিল হাসি।

আমরা এখন ইকোলা স্টেট পার্কে। প্রাকৃতিক পার্ক। এখান থেকে প্রশান্ত দেখা যাবে। তবে এটি যেহেতু সৈকত নয়। নামা যাবে না। এখানে দুপুর পর্যন্ত কাটিয়ে আমরা ক্যানন বিচ যাবো। আমরা হাঁটতে হাঁটতে প্রশান্ত মহাসাগরের কাছে এসে পড়লাম। অনেক পরিবার এসেছে। সবাই ছোটাছুটি করছে। ছবি তোলার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। আমি ছোটাছুটিতে অংশ নিলাম  না। ছবি তোলাতেও নয়। আমি আর প্রশান্ত দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকলাম অনেকক্ষণ। আমি স্থির হয়ে গেছি। সামনে মহাসাগর পিছনে ঘন ভয়াল অরণ্য, চারপাশে অসংখ্য মানুষ মাঝখানে আমি একা। ভীষণ একা। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম দৃশ্যে আমি একা। পৃথিবীর আর একটি সুন্দর দৃশ্যেও আমি ভয়াবহ একা ছিলাম।

স্টাডি ট্যুরে গিয়েছি সেন্ট মার্টিন্স। ক্লাসের বান্ধবীরা তাদের পুরুষ সঙ্গী নিয়ে ঘুরছে। আমার কোন সঙ্গী নেই। আমি কোরালের ভিতর দিয়ে হাঁটছি। হাঁটতে হাঁটতে  সমুদ্রের কাছে চলে আসলাম। বুঝতে পারছি আমার পিছু নিয়েছে কিছু স্থানীয় ছেলে। তারা আমার সাথে কথা বলার খুব চেষ্টা করছে। আমি খুব জোরে হাঁটছি। সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ছেলেগুলোও হাঁটছে  আমার পিছনে। আমাদের ক্লাসের একটি দল দেখলাম। ওদের সাথে কথা বলিনি কোনদিন। প্রথম কথাই ছিলো আমি কি তোমাদের সাথে একটু হাঁটতে পারি। সকালে সেন্টমার্টিন ঘুরতে যখন সবাই বেরিয়েছিল আমিও বেরোলাম। ভীষণ গল্প করছি আমি। আমার সঙ্গী একজন ডাব বিক্রেতা। ডাবওয়ালা আমাকে তার বাসায় নিয়ে যেতে চাইলেন। আমিও গেলাম। কিছুটা ভয় ও লাগছিল। তবু গিয়েছিলাম। তার স্ত্রীর সাথে দেখা করে আসলাম। সমুদ্রের ধারে একা একা হাঁটলাম।

আজও আমি একা। মহাসমুদ্রের কাছে একা। তবে এখানে অদ্ভুত কিছু করা হবে না জানি। কারণ ভাইয়া–ভাবীরা আমাকে চোখে চোখে রাখছেন। যেন আমাদের একটা বড় পরিবার। সেই পরিবারের একটি বোন আমি। কত ভালবাসা। তবু কি ভয়াবহ শূন্যতা। আমি প্রশান্তের দিকে তাকিয়ে শূন্যতা উপভোগ করছি। শিলা ভাবী সেই শূন্যতাকে ভেঙ্গে খান খান করলেন। আরে তুমি এখানে। চল সবাই ওয়েট করছে। নাস্তা দেওয়া হয়েছে। সবার সাথে পরিচিত হবে না? আচ্ছা দাড়াও, সরফরাজ আমার আর আন্টির একটা ছবি তুলে দাও তো। তুমি কিন্তু চুল এই ভাবে দেবে। এইদিকে চুল দিলে তোমাকে ভাল দেখায়। ছবি ভাল আসবে। কেউ আমার চুলে হাত দিলে আমার ভয়াবহ রাগ হয়। এই মুহূর্তে রাগ হচ্ছে না। আমার চোখে পানি এসে যাচ্ছে। আমি রোদ চশমা পরে নিলাম।

অনেকগুলো পরিবার এসেছে। সবার সাথে পরিচয় হচ্ছে। সবচেয়ে ভাল লাগল বাচ্চাদের সাথে পরিচিত হয়ে। কাশেম ভাইয়ের স্ত্রী  আসেননি। ওনার  সাথে ওনার দুই মেয়ে এসেছে। জমজ মেয়ে। ৭-৮ হবে বয়স। দিঠি মিঠি নাম। চট  করে আলাদা করা কষ্টকর। এরা একই রকম করে চুল বেঁধেছে। চুলের ক্লিপের রংও এক। রিপন ভাইয়েরও স্ত্রী আসেননি। কানাঘুষোই শুনছি অসুস্থ। কিন্তু কেউ চিন্তিত নয়। সবাই হাসছে। আমি যা বোঝার বুঝে নিলাম। রিপন ভাইয়ের সাথে ওনার ছেলে এসেছে। বাচ্চাটির বয়স ৫-৬ হবে। মটু, ফর্সা বাচ্চা। তার মধ্যে আবার লাল প্যান্ট পরেছে। তাকে দেখতে লাল টমেটোর মত মনে হচ্ছে।

লাল টমেটোকে নিয়ে ভাবীরা খুব মজা পাচ্ছে। লাল টমেটোর মনে হয় মিঠিকে খুব পছন্দ। এই তিনজন এক সাথে খেলছে। অন্য বাচ্চাদের পাত্তা দিচ্ছে না। লাল টমেটোকে ভাবীরা অনেক প্রশ্ন করছে। মিঠিকে করছে না। লাল টমেটো মিঠির উত্তর দিয়ে দিচ্ছে।

-তোমার বয়স কত?

আমার ছয়, মিঠির আট

-তোমার আম্মু আসেনি?

না আমার আম্মু আসেনি, মিঠির আম্মুও আসেনি।

-নাস্তা দেওয়া হয়েছে। খেয়েছ তুমি?

আমিও খাইনি। মিঠিও খায়নি।

সরফরাজকে এখানে বেশ একা মনে হচ্ছে। তার বয়সের কাছাকাছি কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। দাউদ ভাইয়ের মেয়েকে পাওয়া গেছে। কিন্তু তারা একে অপরকে দেখে লজ্জা পাচ্ছে মনে হল। শিলা ভাবী সরফরাজকে বড়দের সাথে ভলি বল খেলতে পাঠালেন। সরফরাজ খুব ভাল খেলছে। কারণ সে ভলি বলেও ম্যাডেল পেয়েছে।

চারপাশ ধোঁয়ায় ভোরে গেছে। বারবিকিউ হবে। আগুন জ্বালানো হচ্ছে। এর মধ্যে নিশা ভাবী নামাজ পড়তে বসলেন। নিশা ভাবী বেশ সুন্দরী। ওনার ছেলে এবার  ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। কিন্তু ভাবীকে দেখলে সেটি মনে হয় না। নিশা ভাবীকে কঠিন ধার্মিক মনে হল। তবে উনি খুব সাজগোজ করেন বোঝা গেল। হেজাবের ভেতর থেকেও তার সাজগোজ বোঝা যাচ্ছে। ঐ অবস্থাতেই তিনি নামাজে বসলেন। বললেন, ওজু আছে।

আমরা সবাই ম্যাসড পটেটো, কর্ণ আর চিপ্স খেয়েছি। দুপুরের খাবার দিতে দেরি আছে। সবাই গল্পগুজব ফটো সেশন শুরু করল।

আমি বেরোলাম। আমরা আছি পাহাড়ের উপরে। উপর থেকে দেখছি বিচে দু একজন মানুষ হাঁটছে। ওরা কিভাবে নামল বুঝতে পারছিনা। আমি পথ খোঁজার চেষ্টা করছি। চারদিকে ঘন জঙ্গল আর চমৎকার সব প্রাচীন গাছ। দেখি অনেকেই আমার পিছন পিছন চলে এসেছে। শিলা ভাবী বললো, ছবি তোলার জন্য তো এটি চমৎকার জায়গা। আমরা ছবি তুলছি। তবে জায়গাটায়  খুব ঢাল। সাবধানে তুলতে হচ্ছে। পাশে সাপখোপ থাকতে পারে সেই ভয়ও আছে। দাউদ ভাই আর আমি একই এলাকার মানুষ। দাউদ ভাইয়ের স্ত্রী আমাকে একটু আলাদা চোখে দেখছেন মনে হল। তার সব ছবিতেই আমাকে ঢুকিয়ে নিচ্ছেন।

আমার খুব বিচে নামতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু বিচে নামার কোন পথ তৈরি নেই। জায়গাটাও কাদা কাদা হয়ে আছে। তবুও আমি নামতে চাইছি। কেউ নামতে চাইছে না। আমাকেও নামতে দিচ্ছেনা। শুধু নিশা ভাবী বললো তিনিও নামবেন। আমরা নামার চেষ্টা করছি। রিমি আপু এসে কঠিন ধমক দিলেন। তোমরা স্ক্যাজুয়াল দেখনি? ক্যানন বিচতো লিস্টে আছেই। দুপুরে খেয়েই রওনা দেওয়া হবে। রিমি আপুর পিছনে লাল টমেটোও এসেছে। সে  বললো, আমিও নামবো, মিঠিও নামবে। আবার সবার প্রচণ্ড হাসাহাসি। হাসতে হাসতে আমরা ছাউনিতে ফিরলাম।

খাওয়া দাওয়া হল। পরোটা সাথে ঝলসানো মুরগী। অমৃতের মত মনে হল। খাওয়া দাওয়ার পর হল মিটিং। ছেলেরা সবাই এখানে। এলামনাই হিসেবে আমি আর রিমি আপুও থাকলাম। মিটিঙের বিষয়বস্তু আমেরিকায় প্রথম এসে অনেক ছেলেমেয়েরা অসুবিধায় পড়ে কিভাবে তাদের সাপোর্ট দেওয়া যায়, ভাল কাজের জন্য ফান্ড রেইজ করা যায়। নানা খটমট আলাপ। খেয়ে দেয়ে আমরা রওনা দিলাম। আমি এবার দাউদ ভাইয়ের গাড়িতে। রিমি আপু, রাশেদ ভাই সব গুছিয়ে পরে একবারে আসবেন।

আমরা ক্যানন বিচে এখন। প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্র সৈকত। নাম প্রশান্ত হলেও বেশ অশান্ত মনে হল তাকে। বড় বড় ঢেউ সৈকতে আছড়ে পড়ছে। আমি আর রিমি আপু সৈকতে এক সাথে হাঁটছি। অর্ধ নগ্ন তরুণী দেখছি। খারাপ লাগছে না  দেখতে। আমি ঈর্ষা নিয়ে তরুণীদের দেখছি। তরুন–তরুনীদের মধ্যে শেতাঙ্গ শেতাঙ্গিনী ছাড়াও অনেক স্প্যানিশ, ইটালিয়ান আছে মনে হল। তাদের ফর্সা ত্বক, কালো চুল দেখে তাই মনে হচ্ছে। এক তরুণ তরুণীকে দেখছি, জড়িয়ে ধরে বসে আছে। একটু পর পর ঢেউ এসে তাদের ভিজিয়ে দিচ্ছে।

অনেকে ঘর বাড়ি বানাচ্ছে। ভাস্কর্য বানাচ্ছে। বালিতে গলা ডুবিয়ে বসে আছে। অনেকে সানবাথ করছে। অনেককে প্রার্থনা করতে দেখলাম। প্রার্থনা করা একটি তরুণীর সোনালি চুলে সূর্যের কিরণ এসে পড়ছে। চুল আরও আলো ঝলমল হয়ে উঠছে। আমার মনে হচ্ছে সূর্যদেব যেন ওর প্রার্থনা মঞ্জুর করছেন। রাশেদ ভাই আমাদের থেকে দূরে দূরে হাঁটছেন আর ছবি তুলছেন। সম্প্রতি ফটোগ্রাফিকে উনি হবি হিসেবে নিয়েছেন। তবে তিনি ফটো তুলে আর সবার মত ফেসবুকে দিচ্ছেন  না। বাঁধাই করে ঘর ভর্তি করছেন।  কারণ রাশেদ ভাইয়ের কোন ফেসবুক একাউন্ট নেই।

আমরা অনেক ছবি তুললাম। গ্রুপ ছবির ফ্রেমে নিজেদের আটালাম। তবে সমুদ্রটাকে আটাতে পারলাম না। ক্যানন বিচটা অনেক ভাগ হয়ে গেছে। মাঝাখানে একটা ছোট পাহাড়ের মত। সেই পাহাড়ের গায়ে মনে হল তিল পরিমাণ জায়গা নেই। সাদা কবুতরের মত দেখতে অনেকটা পাখিতে ভরে গেছে । আমরা পাখিদের দেখছি। ওরাও আমাদের দেখছে মনে হল। আমরা কিছু সামুদ্রিক প্রাণী আর মাছ দেখলাম। তীরের গা ঘেঁষে ওরা খেলছিল। ওদের থেকে বিদায় নিয়ে আমরা ক্যানন বিচ ছাড়লাম। আমাদের গন্তব্য লাল টমেটোর বাসা। ওখানে আমাদের ডিনারের আয়োজন করা হয়েছে। ইন্ডিয়ান এক মহিলার ক্যাটারিং থেকে ডিনার আনা হবে।

খুব সুন্দর আবাসিক এলাকায় আমাদের গাড়ি থামল। রিপন ভাই ইন্টেলে চাকরি করেন। বেশ বড় সড় মুগ্ধ করার মত বাড়ি ওনার । বাসার ভিতরে ঢুকে আমার মুগ্ধতা আরও বাড়ল। ডুপ্লেক্স বাসার বিশাল ড্রয়িং রুমে আমরা বসেছি। লাল টমেটোর মা, রিপন ভাইয়ের স্ত্রী আসলেন। আমরা তাকে মা হবার জন্য অভিনন্দন জানালাম। ভদ্র মহিলা প্রচণ্ড সুন্দরী। দুধে আলতা গায়ের রং। টোকা দিলেই রক্ত বের হবে মনে হল তবে লম্বায় রিপন ভাইয়ের দেড়গুণ।

প্রচুর খাবারের আয়োজন ছিল। ইন্ডিয়ান মহিলার রান্না ভাল। ইন্ডিয়ান ধাঁচে করেননি। বাংলাদেশি ধাঁচেই করেছেন। সবচেয়ে চমৎকার ছিল মিষ্টিগুলো। আমি মিষ্টি সচারচর খাইনা। তবুও কয়েকটি খেয়ে ফেললাম। খাওয়া দাওয়া শেষে সরফরাজ গায়ল হেমন্তের গান।  চমৎকার গলা। তন্ময় হয়ে শুনছিলাম। বাংলাদেশে ইমরান ভাইয়ের ব্যান্ড ছিল। ভাইয়া কয়েকটি গান করলেন। সবচেয়ে ভাল লাগল মিঠির গান। মিঠির মা রবীন্দ্র সরণীতে গান করতেন। তিনিও গায়লেন। গানের কলি খেলা হল। অনেক আড্ডা, অনেক আনন্দ শেষে আমরা বিদায় নিলাম।

আমি রাশেদ ভাই–রিমি আপুদের গাড়িতে। গাড়ি ছুটছে পোর্টল্যান্ডের পাহাড়ি রাস্তায়। রাশেদ ভাই গল্প করছেন অনেক। সেসব গল্পের কিছু আমার মাথায় ঢুকছেনা। আমার মনে তখন বাজছে সন্ধ্যায় মিঠির গাওয়া গান।

ফুলে ফুলে ঢ’লে ঢ’লে বহে কি’বা মৃদু বায়।।
তটিণী-র হিল্লোল তুলে কল্লোলে চলিয়া যায়।
পিক কি’বা কুঞ্জে কুঞ্জে।।
কুউহু কুউহু কুউহু গায়,
কি জানি কিসের লাগি প্রাণ করে হায় হায়।

কিসের জন্য আমার প্রাণ হায় হায় করছিল জানি না। তবে রিমি আপুর বাসায় এসে আমার প্রাণ আর হায় হায় করার সুযোগ পেল না। এত মানুষ। রাশেদ ভাই ব্যাচেলরগুলোকে হোটেল থেকে বাসায় এনে তুলেছেন। বলেছেন কষ্ট করে হোটেলে থাকার দরকার নেই। গণ বিছানা পাতা হবে। এইখানে থাকো, খাওয়াদাওয়া এখানেই করো। রাশেদ ভাইয়ের কর্মকাণ্ডে আমরা মজা পাচ্ছি। মনে হচ্ছে মামার বাড়িতে এসেছি। মামা–মামী খুব ব্যস্ত আমাদের নিয়ে।

রিমি আপু সকালের রান্না চাপিয়েছেন। আমি, আয়শা ভাবী আর ইমরান ভাইয়ের বোন সাজগোজ করছি। মাঝে মাঝে এসে দেখে যাচ্ছি, আপুর কোন সাহায্য লাগবে কিনা। আসলে সৌজন্যতার খাতিরে আমাদের জিজ্ঞেস করতে হচ্ছে। কারণ ভিতরের ঘরে আমরা খুব মজা করছি। আয়শা ভাবী এমন এমন গল্প করছেন  হাসতে হাসতে পেট ব্যাথা হয়ে যাচ্ছে। গল্পের অনেকগুলো অংশ বেশ অশ্লীল, অশ্লীল অংশ ছাড়া গল্প মজার হয় না। অশ্লীল অংশ শুনে আমি লজ্জা পাওয়ার ভান করছি। আসলে অশ্লীল অংশ শুনতে ভীষণ ভাল লাগছে আমার ।

ভাইয়া ভাবী বিয়ের আগে কেউ কাউকে দেখেনি। আমেরিকা থেকে যেয়ে ভাইয়া সোজা বিয়ের পিড়িতে বসেছেন। হলুদের দিন প্রথম দেখা। ভাইয়া কনেকে দেখে বললেন, তোমাকে নিয়ে একটি গান লিখেছি। আয়শা ভাবীর ডাক নাম আশা। আশা আমার আশা ………তুমিই লুকানো ভালবাসা। ভাইয়া গিটারের তালে তালে চিৎকার করে গান করছেন আশা আমার আশা ………তুমিই লুকানো ভালবাসা। ভাইয়ার লুকানো ভালবাসার গান সবাই শুনছে। ভাবীর বাবা-মামা চাচা দাদা সবাই শুনছেন আর লজ্জায় মুখ লুকাচ্ছেন। ভাবীর বাবা হঠাৎ ভাবীকে ডেকে নিয়ে বললেন, এই বেহায়া ছেলের সাথে কিছুতেই  তোর বিয়ে দেব না। আমাদের গল্পে রিমি আপু যোগ দিয়েছেন। সবাই সবার বিয়ের গল্প বলছে। রাশেদ ভাই আর রিমি আপুরটা শুনলাম। রাশেদ ভাইয়ের মত খটমট লোক ভিতরে ভিতরে এত বড় প্রেমিক আমরা কেউই জানতাম না। এবার আমার পালা এলো। বললাম, আমার তো বিয়ে হয়নি। আয়শা ভাবী বলল, হয়নি সমস্যা নেই। আমরা দেব। এখন তন্দ্রামনি তুমি আমাকে বল কোন ছেলে তোমার পছন্দ? ভাবী আমার নামের সাথে মনি কেন লাগাল বুঝতে পারছি না।

রিমি আপু বললো, এখানে সব ছেলেরা কেন এসেছে জানো?

– গেট টুগেদারে।

আরে গেট টুগেদার না ছাই। এরা সবাই বিয়ের জন্য মেয়ে খুঁজছে। তোমার হাতে তো অনেক অপশন। একজন তোমার বয়সী, বাকিরা তোমার বড়। তুমি শুধু এখন বাছাই করবা। আয়শা ভাবী  বলতে লাগলেন, অমুকে ভাল তমুকে ভাল। আর তোমার তো কাল লম্বা ছেলে ভাল লাগে। ফরহাদকে দেখতে পার, যদিও কিছুদিন আগে ওর গার্লফ্রেন্ড বিয়ে করে কানাডা চলে গেছে। এখন ও একটু বিষণ্ণ। তবে ব্যাপার না, তোমার  আদর ভালবাসা পেলেই ঠিক হয়ে যাবে। বলেই ভীষণ অশ্লীল হাসি। সবাই হাসছে। আমিও হাসছি। রাশেদ ভাই ড্রইং রুম থেকে চিৎকার করলেন, এই তোমরা মেয়েরা এত হাসছ কেন? আমাদের ছেলেদের অসুবিধা হচ্ছে।

রিমি আপু বললেন, কি বাছাইয়ে কার নাম উঠল। আমি বললাম, আমি রাশেদ ভাইয়ের মত কাউকে বিয়ে করব। আমার উত্তর শুনে রিমি আপু হতভম্ব হয়ে গেলেন। ইমরান ভাইয়ের নাম না বলাতে আয়শা ভাবীর মন খারাপ হল কিনা বুঝলাম না।

 


প্রবাসে সিরিজের গল্পসমূহঃ

 পর্ব ১ঃ যাত্রাপথের গল্প
 পর্ব ২ঃ নতুন বাসা, ওরিয়েন্টেশন, রাস্তা হারানো
 পর্ব ৩ঃ পুলিশ আসা, রেজিস্ট্রেশন বিড়ম্বনা
 পর্ব ৪ঃ ডরমেটরির গল্প, প্রথম তুষারপাত
 পর্ব ৫ঃ ইন্টারন্যাশনাল নাইট, বাসা নিয়ে ঝামেলা, শায়লা আপুর চলে যাওয়া
 পর্ব ৬ঃ কামরানকে হাসপাতালে নেওয়া, টেকো সুদীপ আর ব্রিটিশ প্রফেসরের গল্প
 পর্ব ৭ঃ ল্যাব ও ফরাসী যুবকের হৃদয় ভাঙার গল্প।
 পর্ব ৮ঃ সামার এসেছে, বেতন পাইনি, প্রথম বাসা ছেড়ে দিলাম
 পর্ব ৯ঃ সঙ্গীহীন জীবন, সুরিয়া মথুর গল্প, সামারের দিনলিপি, একা পথ চলা
 পর্ব ১০ঃ বিদেশী ভাষা শেখা ও আমেরিকান চাষাবাদের গল্প
 পর্ব ১১ঃ আমার বাইবেল শেখা
 পর্ব ১২ঃ সাজ্জাদের চলে যাওয়া, লিবিয়ান পরিবারের গল্প
 পর্ব ১৩ঃ মুহিত ভাইয়ের গল্প, আমার আগুন ধরিয়ে ফেলা
 পর্ব ১৪ঃ মসজিদ, ঈদ, ইয়ামিনী আসা, নতুন বাসা, আমেরিকান বিয়ে ও অরিগন যাবার গল্প
 পর্ব ১৫ঃ অরিগন ভ্রমন, শুরুর গল্প।
 পর্ব ১৬ঃ অরিগনের গল্প, ক্যানন বিচ, লাল টমেটো
 পর্ব ১৭ঃ
 পর্ব ১৮ঃ
 পর্ব ১৯ঃ

লেখক পরিচিতিঃ

 জান্নাতুন নাহার তন্দ্রা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ‘নর্থ ক্যারোলিনা এ এন্ড টি স্টেট’ ইউনিভার্সিটিতে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ ‘PhD’ করছেন এবং তার গবেষণার বিষয় হল ‘Real time Object detection with Higher Accuracy’। jannatunজান্নাতুন নাহার তন্দ্রার স্কুল জীবন কেটেছে চুয়াডাঙ্গা শহরে, কলেজ জীবন হলিক্রস কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগে। এবং সেখান থেকেই ২০১০ সালে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন তিনি। এরপর একটি সংক্ষিপ্ত কর্মজীবন শেষে ২০১২ সালে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে এবং ২০১৪ সালে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন। জান্নাতুন নাহার তন্দ্রা অবসরে লিখতে ভালবাসেন এবং সে অভ্যাস বশতই আমেরিকার গ্রাজুয়েট প্রোগামে একা একটি মেয়ে পড়তে আসার অভিজ্ঞতা (সাউথ ডাকোটা) একসময় তিনি লিখতে শুরু করেন। এবং তার এই অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘প্রবাসে’ নামে ২০১৫ সালের ‘একুশে বই মেলায়’ তার একটি বই প্রকাশিত হয়। বইটি কোন তথ্যমূলক বই নয় বরং বলা যায় এটি লেখিকার রোজকার ডায়েরী।